বিলুপ্তির পথে এগোতে পারে ইইউ by মাসুম খলিলী

২০১৬ সালকে অনেক বিশ্লেষকই দেখছেন পরিবর্তন ও অস্থিরতার বছর হিসেবে । এই অস্থিরতা শুধু উত্তপ্ত মধ্যপ্রাচ্যে সীমিত থাকছে না। এমনকি এটি শুধু এশিয়ায় বা আফ্রিকাতেই ছড়াবে তা-ও নয়, এর বড় শিকার হতে পারে খোদ ইউরোপ। যাদের বিরুদ্ধে সামরিক হস্তক্ষেপ ও গোয়েন্দা মদদ দেয়ার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সরকারের পতন ঘটিয়ে অস্থিরতাকে উসকে দেয়ার অভিযোগ রয়েছে তারাই এখন সেই অস্থিরতার শিকারে পরিণত হচ্ছে।
ইউরোপের গত অর্ধশতাব্দীর সবচেয়ে বড় অর্জন কী? এই প্রশ্নের জবাব হবে, একটি অভিন্ন ইউরোপ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অগ্রযাত্রা। এই অগ্রযাত্রার দু’টি প্রধান ক্ষেত্র হলো শেনজেন চুক্তির মাধ্যমে এই অঞ্চলের নাগরিকদের মুক্ত চলাচল এবং পণ্যের অবাধ প্রবাহ সৃষ্টি। একই সাথে নিশ্চিত করা হয়েছে ইউরোপের এক দেশের নাগরিকদের অন্য দেশে যাওয়া বা থাকার অধিকার। এর বাইরে দ্বিতীয় লক্ষ্যটি ছিল একটি অভিন্ন মুদ্রাঞ্চল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পুরো অঞ্চলে ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক বিকাশ। এই দু’টি লক্ষ্য বা অর্জনই এখন হুমকির মুখে।
এখনো পর্যন্ত ইউরো জোনের বাইরে রয়েছে ইউরোপের প্রভাবশালী দেশ যুক্তরাজ্য। এখন দেশটি ইইউতে আর থাকবে কি না, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন সৃষ্টি হয়েছে নাগরিকদের মধ্যে। ২০১৬ সালেই এ ব্যাপারে গণভোট অনুষ্ঠিত হতে পারে। ‘ব্রেক্সিট’ অর্থাৎ ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বিদায় নেয়ার ব্যাপারে অনুষ্ঠেয় এই গণভোটে ব্রিটিশ জনমত ক্রমেই জাতীয়তাবাদীদের পক্ষে চলে যাচ্ছে। যদিও এখনো ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে থাকার পক্ষে বেশি মত রয়েছে মর্মে উল্লেখ করা হচ্ছে। তবে ভোটের সময় ঘনিয়ে আসার আগেই যেকোনো পরিবর্তন ঘটতে পারে। জেরেমি কোরবিনের নেতৃত্বে বিরোধী লেবার পার্টি এখন বেশি ঝুঁকছে ইউরো ত্যাগের দিকে। প্রধানমন্ত্রী ডেভিট ক্যামেরন নিজেই ইউরোতে সংস্কার আনার ব্যাপারে উচ্চকণ্ঠ। যদিও তার প্রস্তাবিত সংস্কারের ব্যাপারে ব্রিটেনের প্রতি সবচেয়ে বেশি সহানভূতিশীল জার্মানিও একমত হচ্ছে না। আবার ইইউ থেকে ব্রিটেন বের হয়ে গেলে এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে স্কটল্যান্ড যুক্তরাজ্য থেকে বেরিয়ে যাওয়ার একটি ঝুঁকিও রয়ে গেছে।
২০০৯ সালে ইউরোপীয় অর্থনৈতিক সঙ্কটের পর এই ফেডারেল ইউরোপ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের ব্যাপারে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বিভিন্ন প্রশ্ন উঠতে থাকে। সর্বশেষ সিরীয় শরণার্থীদের ইউরোপমুখী প্রবাহ শুরু হওয়ার পর সঙ্কট তীব্র হয়েছে। উত্তর ইউরোপ ও দক্ষিণ ইউরোপের মধ্যে মতের ব্যবধান এখন প্রবল হয়েছে। উত্তর মনে করছে দক্ষিণের অদক্ষতা ও অক্ষমতা তাদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্য দিকে, দক্ষিণের অভিযোগ উত্তরের বিরুদ্ধে তাদের বাজার একচেটিয়াভাবে দখল করা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার সময় অনুদারতা প্রদর্শন ও কঠিন সব শর্ত আরোপ করার। এই টানাপড়েন উত্তর দক্ষিণ নির্বিশেষে সব দেশে জাতীয়তাবাদী দলগুলোর সমর্থন বাড়িয়েছে, যাকে ইউরোপের সংহতির গোড়ায় আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর পথ ধরে ইইউ থেকে গ্রিসের বিদায় নেয়ার সম্ভাবনা একপর্যায়ে অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে। এই জোন ত্যাগ করতে পারে ফিনল্যান্ডের মতো দেশও। অন্য দিকে, এই উদ্যোগে নতুন যারা অংশীদার হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে তাদের দরজা যেমন সহজে খুলছে না, তেমনি এই জোটে যোগ দেয়ার ব্যাপারে কোনো কোনো দেশ নিজেরাও আগ্রহ হারাতে বসেছে।
অর্থনৈতিক বৈষম্য রয়েই গেছে
ইউরোপে ক্রমবর্ধমান অভিবাসন প্রবাহ ও ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় ঐক্যের প্রতি রাজনৈতিক সমর্থন কমে যাচ্ছে। জোটে যাওয়ার আগে থেকেই পশ্চিম ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর অর্থনৈতিক অবস্থায় ছিল ব্যাপক ব্যবধান। ইইউ গঠনের পর আশা করা হয়েছিল এই ব্যবধানে পরিবর্তন আসবে। কিন্তু ইউরোপীয় জোনের ২৮টি সদস্য দেশের মধ্যে ১৭টি দেশের জাতীয় আয় ইইউর গড় ২৭ হাজার ৪০০ ইউরোর চেয়ে কম। এর মধ্যে পূর্ব ইউরোপের কোনো দেশের আয়ই ইইউ’র গড়ের ওপরে নেই। ইতালি, গ্রিস, পর্তুগালসহ পশ্চিম ইউরোপের অনেক দেশের আয় নিম্নমুখী হয়ে পড়ছে। গোটা ইউরো জোনের ২৮টি দেশের মধ্যে ৫২ শতাংশের বেশি আয় হলো তিন দেশ- জার্মানি, ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের। এর মধ্যে জার্মানি ছাড়া আর কোনো দেশই অর্থনৈতিক সঙ্কট থেকে পুরোপুরি বের হয়ে আসতে পারেনি।
২০০৫ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত ১২ বছরের ইউরোপের অর্থনীতি পর্যালেচনা করে দেখা যায়, পুরো ইউরোপীয় ইউনিয়নে ২০০৪ সালের তুলনায় অর্থনীতির আকার বেড়েছে মাত্র ৯ দশমিক ৭ শতাংশ। আর ইউরো জোনের ১২ বছরের ব্যবধানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৭ শতাংশ। ২০০৯ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পোল্যান্ড ছাড়া একটি দেশও ধনাত্মক প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারেনি। জোটের অনেক দেশ রয়েছে যেগুলোর অর্থনীতি বছরের পর বছর সঙ্কুচিত হচ্ছে। ইতালি, গ্রিস, স্পেন, পর্তুগাল ছাড়া বাকি দেশগুলো অর্থনৈতিক সঙ্কট থেকে কিছুটা বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। কিন্তু ইউরোপের বেশির ভাগ দেশ অর্থনীতির মৌলিক দুর্বলতা থেকে মুক্ত হতে পারছে না। এতে ফেডারেল ইউরোপ গঠনের ব্যাপারে হতাশা ছড়িয়ে পড়ছে।
শেনজেন চুক্তির আওতায় ইউরো জোনের দেশগুলো যে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের বিলোপ ঘটিয়েছে তার উল্টো পথে যাওয়ার দাবি উঠতে শুরু করেছে। ফ্রান্স, পশ্চিম জার্মানি, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস ও লুক্সেমবার্গ ১৯৮৫ সালে যখন শেনজেন চুক্তি স্বাক্ষর করে, তখন তারা এমন এক ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছিলেন যেন সব দেশের মানুষ ও পণ্য কোনো বাধা ছাড়া এক দেশ থেকে অন্য এক দেশে চলাচল করতে পারে। একের পর এক বাধা অতিক্রম করে এই স্বপ্নের অনেকখানি বাস্তবায়ন হয়েছে। ১৯৯৫ সালে শেনজেন চুক্তি বাস্তবায়নের পর এই চুক্তির স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ বিলোপ করা হয়েছে এবং ২৬ দেশের জন্য একটি সাধারণ ভিসা-নীতি তৈরি করা হয়েছে।
একটি ফেডারেল ইউরোপ সৃষ্টি ছিল শেনজেন চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। এ লক্ষ্যে পৌঁছতে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ বিলোপ করে সদস্য দেশগুলো তাদের জাতীয় সার্বভৌমত্বের একটি মৌলিক উপাদান ইইউর কাছে সমর্পণ করে। এ জন্য স্বাক্ষরকারীদের পরস্পরের প্রতি আস্থা ছিল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এর মাধ্যমে শেনজেন অঞ্চলে প্রথম এন্ট্রি দেশের ওপর আগত বিদেশীদের পরিচয় এবং মালামাল চেক করার দায়িত্ব অর্পিত ছিল। কোনো ব্যক্তি একবার একটি শেনজেন দেশে প্রবেশ করলে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ ছাড়া ইউরোপের বেশির ভাগ দেশে অবাধে যেতে পারেন।
ঠাণ্ডা যুদ্ধের শেষে ১৯৯০-এর দশকে শেনজেন চুক্তি বাস্তবায়নকালে ইইউ সদস্যরা স্থায়ী অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের প্রত্যাশায় অনেক সংবেদনশীল বিষয়ে জাতীয় সার্বভৌমত্ব ছেড়ে দেয়। ইউরো জোনের সৃষ্টি সম্ভবত ছিল এই সময়ের সবচেয়ে প্রতিনিধিত্বশীল চুক্তি। কিন্তু এর পর থেকে ইউরোপে কয়েকটি বিষয়ে পরিবর্তন এসেছে আর সদস্য দেশগুলো আগে নেয়া অনেক সিদ্ধান্ত সম্পর্কে প্রশ্ন উত্থাপন শুরু করেছে।
গত ছয় বছর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সম্ভবত ইউরোপের অর্থনৈতিক সঙ্কট এবং তার বিভিন্ন উপজাত হিসেবে উগ্র জাতীয়তাবাদী দলগুলোর উত্থান। ইউরোপে শরণার্থী উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর ঘটনা সাম্প্রতিক কালের হলেও এর বিশেষ চাপ পড়ে গ্রিস এবং ইতালির মতো ইইউর সীমান্তবর্তী এবং ফ্রান্স এবং জার্মানির মতো অর্থনৈতিক শক্তিমান দেশগুলোর ওপর। শেনজেন চুক্তি এই প্রথমবারের মতো প্রশ্নবিদ্ধ না হলেও ক্রমবর্ধমান শরণার্থী সংখ্যা, শক্তিশালী জাতীয়তাবাদী দলের উত্থান ও ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সমন্বিত অবস্থা বড় ধরনের সঙ্কট সৃষ্টি করেছে। ইউরোপের নেতৃস্থানীয় সরকার নিজ নিজ দেশের রাজনৈতিক গ্রুপগুলো থেকে শেনজেন চুক্তির পুনর্গঠন এবং কিছু ক্ষেত্রে তা রদ করার দাবির মুখে পড়ছে।
উত্তর ইউরোপের দেশগুলো এখন সীমান্ত কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা এবং ইইউ অঞ্চলে পৌঁছানোর পর শরণার্থীদের ঠিকভাবে ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিতে ব্যর্থতার জন্য ভূমধ্যসাগর তীরবর্তী দেশগুলোর সমালোচনা করছে। এ কারণে এসব অভিবাসী আশ্রয়ের আবেদন করতে মহাদেশের অন্যত্র যেতে পারছে। ফ্রান্স এবং অস্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ ইতালি ছেড়ে আসতে আশ্রয়প্রার্থীদের সুযোগ দেয়া এমনকি উৎসাহিত করার জন্য রোমকে অভিযুক্ত করে ইতালির সাথে তাদের সীমান্ত বন্ধ করে দেয়ার হুমকি দিয়েছে। জুনের শেষ দিকে ফ্রান্স সংক্ষিপ্তভাবে সীমানা বন্ধও করে দেয়।
অন্য দিকে, দক্ষিণ ইউরোপের দেশগুলো সংহতি প্রকাশে ব্যর্থতার জন্য উত্তর ইউরোপের প্রতিবেশীদের সমালোচনা করে। ইতালি ও গ্রিস ভূমধ্যসাগরীয় শরণার্থীদের উদ্ধারে টহল জোরদার ও অভিবাসীদের আশ্রয় দিতে অধিক তহবিল দাবি করেছে। এরা ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিবাসন কোটা প্রবর্তনেরও দাবি করেছে। অথচ এ দাবি মধ্য ও পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলো প্রত্যাখ্যান করে স্বেচ্ছাসেবী ভিত্তিতে শরণার্থী বিতরণ করা উচিত বলে মত প্রকাশ করছে।
অভিবাসন সঙ্কট শেনজেনের সদস্যদের মধ্যে এবং শেনজেন অ-সদস্য প্রতিবেশীদের মধ্য বিরোধ সৃষ্টি করছে। সম্প্রতি অভিবাসীদের ফরাসি বন্দর থেকে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিতে চেষ্টার জন্য ফ্রান্সকে অভিযুক্ত করে যুক্তরাজ্য। তবে সার্বিয়ার সাথে হাঙ্গেরির সীমান্তে বেড়া নির্মাণ এবং সীমানা সামরিকীকরণের হুমকি দেয়া ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার সবচেয়ে দৃশ্যমান একটি উদাহরণ ছিল।
অভিবাসন বেড়ে যাওয়া এবং শেনজেনের ত্রুটি
ইউরোপীয় ইউনিয়ন এখন দু’টি ওভারল্যাপিং সমস্যার মোকাবেলা করছে। এক দিকে ইইউকে একটি নতুন অভিবাসননীতি অবলন্বের জন্য সংগ্রাম করতে হচ্ছে। ইইউ সদস্যদের মধ্যে অভিবাসন আইন সংস্কারের জন্য একাধিক বৈঠক হয়েছে। জার্মানি কয়েক মাস আগেও এ সংক্রান্ত ডাবলিন প্রবিধান পরিবর্তনে অনিচ্ছুক ছিল। সে দেশটিই এখন তাতে পরিবর্তন আনতে নেতৃত্ব দিচ্ছে। এই প্রক্রিয়া অনুযায়ী অভিবাসী প্রথম যে দেশে এসেছেন, সেখান থেকে আশ্রয় প্রার্থনার কার্যক্রম শুরু করতে হবে। জার্মানি নিজে এই বছরে আট লাখ শরণার্থী নেবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে, অথচ এর মধ্যে সেখানকার অভিবাসী আশ্রয়ীর ওপর আক্রমণের ঘটনা বাড়ছে।
বার্লিনের প্রস্তাব হলো নিরাপদ বিবেচিত দেশের একটি সাধারণ তালিকা করতে হবে যেসব দেশের নাগরিকদের ইউরোপীয় ইউনিয়নে আশ্রয় দেয়ার আবেদন মঞ্জুর করা হবে না। এ তালিকার মধ্যে আলবেনিয়া ও ম্যাসেডোনিয়ার মতো পশ্চিম বলকান অঞ্চলের দেশ অন্তর্ভুক্ত করা হবে, যারা গৃহযুদ্ধ থেকে বাঁচতে আশ্রয়ের জন্য অনুরোধ জানানোর মতো গুরুতর মানবিক সঙ্কটের মুখোমুখি নয়। জার্মানির দ্বিতীয় প্রস্তাবটি হলো অভিবাসীদের চিহ্নিত করা, তাদের আবেদন প্রক্রিয়াকরণের জন্য অধিক তহবিল বরাদ্দ এবং গ্রিস ও ইতালিতে এ সংক্রান্ত কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা। সবশেষে, বার্লিন ইউরোপীয় ইউনিয়নজুড়ে সব দেশে অভিবাসীর আনুপাতিক বিতরণের প্রস্তাবকে এগিয়ে নিতে চায়।
জার্মানির উত্থাপিত প্রতিটি পয়েন্ট নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক হয়। অভিবাসনের একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে কারা যুক্তিগ্রাহ্য আশ্রয়প্রার্থী এবং কারা অর্থনৈতিক অভিবাসী তা চিহ্নিত করা হয়। ভূমধ্যসাগরীয় ইউরোপের বেশির ভাগ দেশের অর্থ ও জনবল সঙ্কটের জন্য অবৈধ অভিবাসীদের বিতাড়িত করা জটিল হয়ে দাঁড়ায়। উপরন্তু, ভূমধ্যসাগরীয় দেশগুলো শুধু মহাদেশজুড়ে অভিবাসীদের পুনর্বিতরণ করার সুস্পষ্ট ব্যবস্থা ছাড়াই জরুরি পরিস্থিতিতে তাদের সীমানায় অভিবাসন সেন্টার করেছে। মধ্য ও পূর্ব ইউরোপীয় বেশ কিছু দেশ অভিবাসীদের বাধ্যতামূলক কোটা প্রবর্তনে ইউরোপীয় কমিশনের সাম্প্রতিক পরিকল্পনার বিরোধিতা করছে। এই বিরোধিতার সহজে অবসান হবে বলেও মনে হচ্ছে না।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের দ্বিতীয় সমস্যা হলো, শেনজেন চুক্তি নিয়ে করণীয় সম্পর্কে সিদ্ধান্তে আসা। এই চুক্তি অনুসারে অবৈধ অভিবাসীদের পক্ষে শেনজেন সদস্য দেশগুলোর মধ্যে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করার সুযোগ রয়েছে। আর এতে কিছু নিরাপত্তা প্রশ্নও উত্থাপিত হচ্ছে। বেশ কিছু সদস্য দেশ ইউরোপে পৌঁছা হাজার হাজার অভিবাসীর মধ্যে কিছু সন্ত্রাসী থাকতে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করছে। ফ্রান্সের সন্ত্রাসী ঘটনার পর এই উদ্বেগ আরো জোরালোভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে। এ ঘটনার আক্রমণকারী ফ্রান্স থেকে বেলজিয়ামে চলে গেছে বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। সীমান্ত নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা বিলোপ করার ফলে বস্তুত সম্ভাব্য নিরাপত্তা হুমকি শনাক্ত করার একটি স্তর বিদায় হয়ে গেছে।
কট্টর জাতীয়তাবাদী দলের উত্থানও শেনজেন চুক্তির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফিনল্যান্ডে একটি জাতীয়তাবাদী দল ইতোমধ্যে সরকারি জোটের সদস্য হয়েছে। ইউরো থেকে বের হয়ে যাওয়ার পক্ষের অভিবাসন-বিরোধী দল ডেনমার্ক, সুইডেন ও হাঙ্গেরির মতো দেশে প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে। ফ্রান্সে সব মতামত জরিপে উঠে আসছে ইউরো-বিরোধী ন্যাশনাল ফ্রন্ট ২০১৭ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দ্বিতীয় রাউন্ড পর্যন্ত চলে যেতে পারে। এই জাতীয়তাবাদী দলগুলোর সবাই বিশ্বাস করে, তাদের নিজ দেশের জাতীয় অভিবাসন আইন কঠোরতর করতে হবে এবং শেনজেন চুক্তি বিলুপ্ত না করলেও এতে বড় রকমের সংশোধনী আনতে হবে।
শেনজেন চুক্তির ভবিষ্যৎ
ইউরোপীয় ইউনিয়ন সম্ভবত শিগগিরই শেনজেন চুক্তি ছেড়ে যাবে না। সমালোচনা সত্ত্বেও চুক্তিটির কারণে ইউরোপজুড়ে পণ্য পরিবহনে খরচ কমে গেছে । আন্তর্জাতিক সীমানা পার করার জন্য ট্রাকের আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয় না। সীমানা পার হতে পাসপোর্ট এবং ভিসার আর প্রয়োজন হয় না বলে এটি পর্যটক এবং সীমান্ত শহরে বসবাসকারী মানুষের উপকারে আসে। সবশেষে এই চুক্তি সরকারগুলোর সামনে অনেক অর্থ সাশ্রয়ের সুযোগ এনে দিয়েছে। তাদের আর ভূখণ্ডের সীমানা পাহারা দেয়ার প্রয়োজন হচ্ছে না।
এর পরও সম্ভবত দেশের সীমানা নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রবর্তন করার জন্য সংস্কার আনা হবে শেনজেন চুক্তির। শেনজেনে স্বাক্ষরকারী সদস্য দেশগুলো জাতীয় নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকির মতো অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে নিজেদের সীমান্তের নিয়ন্ত্রণ সাময়িকভাবে পুনঃপ্রবর্তন করার ব্যাপারে একমত হতে পারে। এর প্রথম পদক্ষেপ ২০১৩ সালে নেয়া হয়েছিল; কিন্তু তখনকার সংস্কারের আওতায় ইউরোপীয় কমিশনের সাথে পরামর্শক্রমে সর্বাধিক ১০ দিনের জন্য সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রবর্তন করার ব্যবস্থা করা হয়। সেটাকে স্পষ্টভাবে সীমিত করা হয়েছিল অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা হুমকির ক্ষেত্রে, অভিবাসন ঠেকানোর কোনো বিষয় সেখানে ছিল না।
২০১৬ সালেই ইইউ সদস্য দেশগুলোকে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে আরো ক্ষমতা ও নিজস্ব সিদ্ধান্তের এখতিয়ার দেয়া হতে পারে। উত্তর ইউরোপে ইইউ দেশগুলো কার্যকরভাবে তাদের সীমানা নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হলে তাদের সদস্যপদ স্থগিত রাখা অথবা তাদের ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমানার বাইরে ঠেলে দেয়া হতে পারে। এ সময় নতুন ইইউ সদস্য দেশগুলোর জন্য শেনজেন অঞ্চলে প্রবেশ কঠিন হতে পারে। রোমানিয়া ও বুলগেরিয়ার মতো দেশগুলো প্রায় এক দশক ধরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হলেও তারা এখনো শেনজেনে যোগদানের জন্য অপেক্ষা করছে। তাদের জোনে গ্রহণ করতে কিছু দেশ থেকে প্রতিবন্ধকতা আসতে পারে।
এমনকি শেনজেন চুক্তির একটি যথোপযুক্ত সংস্কার না হলে সদস্য দেশগুলো ট্রেন ও বাসস্টেশনে এবং বিমানবন্দরে পুলিশ নিয়ন্ত্রণ আরো ব্যাপকতর করতে পারে। বেশ কিছু দেশ আগে থেকেই, ট্রেন ও বাসে আকস্মিকভাবে পুলিশি নিয়ন্ত্রণ চালিয়ে যাচ্ছে । এটি সামনে আরো বাড়তে পারে। রক্ষণশীল দলগুলোর চাপে অনেক ইইউ দেশ বিশেষত উত্তর ইউরোপের দেশগুলো তাদের অভিবাসন আইন কঠোর করতে পারে, যাতে নতুনরা সহজে অভিবাসীদের ওয়েলফেয়ারের সুযোগ নিতে না পারে।
বলা যায়, শেনজেন চুক্তি দুর্বল হওয়ার অর্থ জনগণের অবাধ চলাচলের সুযোগও দুর্বল হয়ে পড়া, যেটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি মুখ্য অর্জন ছিল। চুক্তি করা এবং অবাধ চলাচলের সুযোগ দেয়ার নীতিমালা এক জিনিস নয়। সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের অস্তিত্ব থাকুক বা না থাকুক যেকোনো ইইউ নাগরিকের সদস্য রাষ্ট্রে থাকা বা ট্রানজিট লাভের অধিকার রয়েছে; কিন্তু শেনজেন চুক্তির নকশা তৈরি করা হয়েছিল মানুষের অবাধ চলাচল জোরদার এবং সীমানা ছাড়া একটি মহাদেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে। বলার অপেক্ষা রাখে না, শেনজেন চুক্তির সম্ভাব্য সংস্কার এই মৌলিক নীতির ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলবে। একবার যদি মৌলিক নীতি দুর্বল হয় তাহলে অন্যান্য অর্জন একইভাবে সঙ্কুচিত করার দরজা খুলে যাবে। এর মধ্যে ইউরোর পাশাপাশি আবার জাতীয় মুদ্রা চালুর দাবিও উঠেছে কোনো কোনো দেশে। তবে এখনকার জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান হুমকি হলো জনগণের মুক্ত চলাচলের সুযোগ কমে যাওয়া। যার ফলে পণ্যের মুক্ত প্রবাহও দুর্বল হয়ে পড়বে, যার অনিবার্য পরিণতি হবে বর্তমান অবয়বে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবসান ঘটা। আর ফেডারেল ইউরোপ গড়ার স্বপ্নও এতে ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যেতে পারে।
mrkmmb@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.