২০২৫ সালে যুদ্ধে নিহত হয়েছেন প্রায় আড়াই লাখ মানুষ
মঙ্গলবার (৯ জুন) প্রকাশিত অসলোভিত্তিক পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের বার্ষিক ‘কনফ্লিক্ট ট্রেন্ডস’ নামের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছর বিশ্বে অন্তত একটি রাষ্ট্র জড়িত ছিল এমন ৬৫টি সংঘাতের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। ১৯৪৬ সালের পর এটিই সর্বোচ্চ সংখ্যা।
প্রতিবেদনে বলা হয়, রাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি সংঘাতও ৮০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ২০২৪ সালের তুলনায় এ ধরনের সংঘাত দ্বিগুণ হয়ে আটটিতে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত সংঘর্ষ, আফগানিস্তান-পাকিস্তান উত্তেজনা, কম্বোডিয়া-থাইল্যান্ড সীমান্ত বিরোধ, ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ এবং সিরিয়ায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান।
প্রতিবেদনটির গবেষক সিরি আস রুস্তাদ বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে ইতিবাচক কিছু খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সাধারণত আমি পরিস্থিতির মধ্যে কিছুটা হলেও আশাবাদী দিক বের করার চেষ্টা করি। কিন্তু এবার সংখ্যাগুলো সত্যিই বিস্ময়কর ও উদ্বেগজনক।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সাল ছিল স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের তৃতীয় সর্বাধিক প্রাণঘাতী বছর। গত বছর যুদ্ধ ও সংঘর্ষে সরাসরি প্রায় ২ লাখ ৪৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৭৬ হাজার ৫০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে বেসামরিক নাগরিকদের সরাসরি লক্ষ্য করে চালানো হামলায়। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল মাত্র ১৪ হাজার ২০০।
বেসামরিক প্রাণহানির এই বড় বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে সুদানের সংঘাতকে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি। দেশটির সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনীর মধ্যে চলমান যুদ্ধে দারফুর অঞ্চলের এল-ফাশের শহরে অবরোধ ও গণহত্যার ঘটনায় প্রায় ৬০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর কেবল ১৯৯৪ ও ২০২১ সালে এর চেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছিল। ১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডার গণহত্যা এবং ২০২১ সালে ইথিওপিয়ার টাইগ্রে অঞ্চলের যুদ্ধ সেই রক্তক্ষয়ী ঘটনার জন্য দায়ী ছিল।
রুস্তাদ বলেন, গত পাঁচ-ছয় বছরে একসঙ্গে একাধিক বড় যুদ্ধ ও সংঘাত চলতে দেখা যাচ্ছে। একটি সংঘাত শেষ হওয়ার আগেই আরেকটি শুরু হচ্ছে। বিশ্ব কোনো বিরতি পাচ্ছে না। আগের সময়ের সঙ্গে এটাই বড় পার্থক্য। এখন বৈশ্বিক সংঘাতের উচ্চমাত্রার তীব্রতা প্রায় অব্যাহতভাবে চলছে।
উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন উপসালা কনফ্লিক্ট ডাটা প্রোগ্রামের তথ্যের ভিত্তিতে পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের এই গবেষণা পরিচালিত হয়েছে। প্রতিবেদনটি সংঘাতকে তিনটি ভাগে বিভক্ত করেছে, রাষ্ট্র-জড়িত সংঘাত, অ-রাষ্ট্রীয় সংঘাত এবং বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে একতরফা সহিংসতা।
রাষ্ট্র-জড়িত সংঘাতের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল ছিল আফ্রিকা, যেখানে ২৯টি সংঘাত রেকর্ড করা হয়েছে। এরপর রয়েছে এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আমেরিকা মহাদেশ ও ইউরোপ।
রুস্তাদের মতে, বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে আক্রমণাত্মক দেশগুলোর একটি হলো ইসরায়েল। গাজা, সিরিয়া, লেবানন, ইরান এবং ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের সংঘাতে ইসরায়েলের সম্পৃক্ততা স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।
তিনি যুক্তরাষ্ট্রের দিকেও ইঙ্গিত করে বলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরার পর শুধু সামরিক উত্তেজনাই নয়, বাণিজ্যিক বাধাও বেড়েছে।
রুস্তাদ বলেন, সহযোগিতার পথ ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ কার্যকরভাবে কাজ করছে না। বিশ্ব আরও বেশি মেরুকৃত হয়ে উঠছে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও কূটনৈতিক উদ্যোগ দুর্বল হয়ে পড়ায় বৈশ্বিক সংঘাতের ঝুঁকি আরও বাড়ছে।
সূত্র : এএফপি
![]() |
| গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় ধ্বংস হওয়া একটি ভবনের ধ্বংসস্তূপে ফিলিস্তিনিরা। ছবি : সংগৃহীত |

No comments